
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: যথাযোগ্য মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে হাই কমিশন দুই পর্বে কর্মসূচির আয়োজন করে—প্রথম পর্বে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
দিনের কর্মসূচির সূচনা হয় হাই কমিশন প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও অর্ধনমিতকরণের মাধ্যমে। পরে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর হাই কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীরা পর্যায়ক্রমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়। ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালিত হয়। দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রেরিত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পৃথক বাণী পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর সাধারণ কনফারেন্সের প্রেসিডেন্ট প্রেরিত ভিডিও বার্তা প্রদর্শন করা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে মাতৃভাষাভিত্তিক ও বহুভাষিক শিক্ষা নিশ্চিত করে প্রতিটি শিশুর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমান শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রথম সচিব (বাণিজ্য) প্রণব কুমার ঘোষের সঞ্চালনায় আলোচনা পর্বে এ বছরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য—“Youth Voices on Multilingual Education”—উপলক্ষে বহুভাষিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। আলোচনায় বক্তব্য রাখেন ড. মোহাম্মদ তারিকুর রহমান, প্রফেসর ও ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ইউনিভার্সিটি অব মালয়া; মোহাম্মদ আলী তারেক, সিনিয়র লেকচারার, ইউনিভার্সিটি অব মালয়া; ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি; মালয়েশিয়ায় প্রথম বাংলা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মিস তিয়াশা কাবেজ; এবং এনবিএল মানি ট্রান্সফারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী হায়দার মর্তুজা। বক্তারা বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষার প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বহুভাষিক দক্ষতার অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাতৃভাষার শিকড়কে দৃঢ় রেখে অন্যান্য ভাষা শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পরিবারসহ সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কৌশিক সরকার (মাহসা ইউনিভার্সিটি) এবং রাশনি উম্মায়া সারা (ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া) আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
হাইকমিশনার তাঁর বক্তব্যে বলেন, “মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় যারা বুকের রক্ত দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভাষার অধিকারের জন্য জীবন বিসর্জনের এ ঘটনা শুধু বাঙালি জাতির গর্ব নয়, বরং সমগ্র বিশ্বে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অনুপ্রেরণার উৎস।” তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষিকতার প্রতীক। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা জোরদার করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।” তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন জানান এবং সাফল্য কামনা করেন।
দ্বিতীয় পর্বে স্থানীয় শিল্পীরা ভাষা আন্দোলনভিত্তিক গান ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করেন, যা অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠান শেষে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষ্যে উপস্থিত অতিথিদের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং হাই কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply