
দেশের তারুণ্যের শক্তিকে উজ্জীবিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আয়োজিত এক মাস ২০ দিনব্যাপী ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ শেষ হচ্ছে ১৯ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই মহোৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল ‘এসো দেশ বদলাই, পৃথিবী বদলাই।’ প্রতিপাদ্যকে ঘিরে দেশব্যাপী ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে এই উৎসব।
এই উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন তৈরি করা, সহযোগিতার নীতি প্রচার করা এবং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করা। শহর থেকে গ্রাম, প্রান্তিক ও অনগ্রসর এলাকা—সর্বত্র সকল শ্রেণি-পেশার তরুণ-যুবকের অংশগ্রহণে উৎসবটি উদ্যাপিত হয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যবোধ প্রচারের পাশাপাশি তরুণদের সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনা বিকাশে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
উৎসবটি দেশব্যাপী উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিদিন শত শত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যাপিত হয়েছে। এতে ৭১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৩ জন তরুণ-যুবক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে ২৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭১ জন নারী এবং ৪৪ লাখ ২৪ হাজার ৩০২ জন পুরুষ। মোট ১৩ হাজার ৭১১টি ইভেন্টের মধ্যে নারীদের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ইভেন্ট ছিল ২ হাজার ৯৩১টি।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ফুটবল টুর্নামেন্ট: অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল টুর্নামেন্টে মেয়েদের ৮৫৫টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ২৫,৬০০ মেয়ে অংশগ্রহণ করে।
বিশেষ ফুটবল ইভেন্ট: চা শ্রমিক ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জন্য সিলেটে ফুটবল প্রতিযোগিতা, কক্সবাজারে বিচ ফুটবল, ৬৪ জেলায় অ-১৫ ফুটবল টুর্নামেন্ট, অ্যামপিউটি ফুটবল ফেস্টিভাল এবং ঢাকায় ইয়াং ডিপ্লোমেটদের নিয়ে প্রীতি ম্যাচ।
ক্রিকেট ইভেন্ট: বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল), জাতীয় স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট (৩৫০টি স্কুল), আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট (৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়) এবং বিপিএল মিউজিক ফেস্ট।
অন্যান্য ক্রীড়া আয়োজন: ওপেন আরচারি প্রতিযোগিতা,৪০০ জন পুরুষ ও মহিলার অংশগ্রহণে তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতা,যুব কাবাডি প্রতিযোগিতা,দেশীয় ও গ্রামীণ খেলা (কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা, বউচি, গোল্লাছুট, ঘুড়ি উৎসব, সাইক্লিং ইত্যাদি)
তরুণদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের জন্য দেশব্যাপী আয়োজিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম, যেমন:পিঠা উৎসব, লোকসংগীত ও নজরুল সংগীত সন্ধ্যা,বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা,বিজ্ঞান কুইজ, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ,ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন,শহিদদের গল্প বলা, গ্রাফিতি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা
পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতনতা বাড়াতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, যেমন:শূন্য বর্জ্য ক্যাম্পেইন (বিপিএল ভেন্যুতে),বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান,ব্রেস্ট ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা কর্মশালা,শীতবস্ত্র বিতরণ, জিরো ওয়েস্ট ব্রিগেড গঠন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করে উদ্যাপিত হয় উৎসবটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে আয়োজন করা হয়:যুব উদ্যোক্তা মেলা ও যুব সমাবেশ,উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক বিতর্ক ও কেইস কম্পিটিশন,আন্তর্জাতিক পুষ্টি অলিম্পিয়াড,সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও তারুণ্যের কনসার্ট।
এই উৎসব শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৮০টি মিশনেও ব্যাপকভাবে উদ্যাপিত হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন।
উৎসবটি সফলভাবে বাস্তবায়নে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং ২৩টি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা একযোগে কাজ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় এই বিশাল আয়োজন বাস্তবায়িত হয়।
‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ তরুণদের জন্য শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি একটি অনুপ্রেরণা, একটি নতুন স্বপ্নের বীজ। এই আয়োজন তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধারা আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা যায়।
Leave a Reply