
ধলই সীমান্তে অসীম সাহসিকতায় শত্রুর এলএমজি পোস্ট ধ্বংস করে সহযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সুগম করেছিলেন তিনি
আজ বুধবার ২৮শে অকক্টোবর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন তিনি। তাঁর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার মহেশপুর থানার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হামিদুর রহমান। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হতো। কৈশোরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ থেকেই তিনি সৈনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হন হামিদুর রহমান। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষণ শুরু করেন তিনি। তবে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। সেনানিবাসে হামলার সময় কয়েকজন রিক্রুটের সঙ্গে পাহাড়ে আশ্রয় নেন তিনি। পরে সেখান থেকে বের হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন।
সেখানে নিয়মিত সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দেন হামিদুর রহমান। একপর্যায়ে তাঁকে কোম্পানি কমান্ডারের রানার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অভিযানে তিনি নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জীবনের শেষ যুদ্ধ ছিল সিলেট অঞ্চলের ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের অভিযান। বর্তমানে ধলই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত এলাকায় অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত ফাঁড়িতে পাকিস্তানি বাহিনী শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কংক্রিটের বাংকারে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র স্থাপনের পাশাপাশি ফাঁড়ির সামনে মাইন ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর ভোররাতে ধলই ফাঁড়ি দখলে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করেন। ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানি অভিযানে অংশ নেয়। শুরুতে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হলেও পাকিস্তানি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ ও অবিরাম গুলিবর্ষণে তাঁদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে শত্রুপক্ষের একটি হালকা মেশিনগান (এলএমজি) থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোম্পানি অধিনায়কের নির্দেশে হামিদুর রহমান শত্রুর মেশিনগান পোস্ট নিষ্ক্রিয় করার দায়িত্ব নেন।
এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি ক্রলিং করে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ ধরে শত্রুর বাংকারের দিকে এগিয়ে যান। চা-বাগানের সেচের খাল ব্যবহার করে তিনি এলএমজি পোস্টের কাছাকাছি পৌঁছান। শত্রুর নজরে পড়ার পরও পিছিয়ে না গিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামিদুর রহমান দুই পাকিস্তানি সৈন্যের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তাঁদের পরাস্ত করেন এবং গুরুতর আহত অবস্থায়ও শত্রুর এলএমজি বাংকারে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মেশিনগানটি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হন। এ সময় তিনি শহীদ হন।
তাঁর এই আত্মত্যাগের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়। পরে তাঁরা ধলই সীমান্ত ফাঁড়ির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো দখল করতে সক্ষম হন। ধলইকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে এবং ৩ নভেম্বরের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ফাঁড়িটি দখলে নিতে সক্ষম হন।
দেশের স্বাধীনতার জন্য অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে। তিনি বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন।
যুদ্ধের পর সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকায় সমাহিত করেন। দীর্ঘদিন পর ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর তাঁর দেহাবশেষ ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জীবন কেবল একজন সাহসী সৈনিকের আত্মত্যাগের কাহিনি নয়; এটি দেশপ্রেম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও সহযোদ্ধাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার অনন্য দৃষ্টান্ত। শত্রুর প্রবল প্রতিরোধের মুখেও পিছিয়ে না গিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর লড়াই বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
Leave a Reply