
শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে, সব নির্বাচন বৃহস্পতিবার; তফসিল ঘোষণা হবে ভোটের ছয় সপ্তাহ আগে
দেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পাঁচ ধাপে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ নির্বাচনী কার্যক্রম। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি ধাপের ভোট বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় কমিশনের বৈঠক শুরু হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা শেষে দুপুর ১টার দিকে বৈঠক শেষ হয়।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ভোটগ্রহণের ছয় সপ্তাহ আগে ঘোষণা করা হবে। জেলা ধরে নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এ ক্ষেত্রে উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হবে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট হবে ৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর প্রায় আড়াই মাস বিরতি দিয়ে ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। চতুর্থ ধাপের ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ মে। আর ২৭ মে পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ নির্বাচনী কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব ধাপের ভোট বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার। তবে কোন ধাপে কোন জেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ভোট হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে জানা যাবে।
জেলা ধরে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনার বিষয়ে কমিশন জানিয়েছে, এতে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনার সুযোগ থাকবে। উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও কমিশনের পরিকল্পনার অংশ।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রাথমিক সময়সূচি নিয়ে এর আগে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটের প্রাথমিক তারিখ ঘোষণা করেছিল। এ নিয়ে সরকারের অসন্তোষের মুখে পড়ে নির্বাচন কমিশন।
পরে দুই দিনের মাথায় আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর কমিশন আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এর প্রায় এক মাস পর সোমবার আবারও কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নির্বাচনের ধাপ ও ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা করে কমিশন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানান নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ আর কোনো সংঘাতময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সংঘাতপূর্ণ হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি জানান, সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং নির্বাচনী কার্যক্রম যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যেই কমিশন কাজ করবে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামীণ এলাকার নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সংঘাতের আশঙ্কাও দেখা দেয় বিভিন্ন সময়ে।
এ পরিস্থিতিতে পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা ঘোষণা এবং সংঘাতমুক্ত ভোটের আশ্বাসকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ থাকবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর।
ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণের পর এখন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর প্রার্থী ও ভোটারদের নজর থাকবে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার দিকে। কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ভোটের ছয় সপ্তাহ আগে তফসিল প্রকাশ করা হবে। এতে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং নির্বাচনী প্রচারের সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এখন পর্যন্ত ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, জানুয়ারির শেষ ভাগে প্রথম ধাপের ভোট শুরু হয়ে মে মাসের শেষ সপ্তাহে পঞ্চম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা ধরে ভোট সম্পন্ন করা এবং উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এবং ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা। কমিশনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও সংঘাতমুক্ত নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই হবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
Leave a Reply