
ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, তারা যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারেন—সে লক্ষ্যেই আসন্ন গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুযোগ নিয়েই শাসকগোষ্ঠী বারবার ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে। এই পথ চিরতরে বন্ধ করতেই জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে এবারের গণভোট।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে ‘আসন্ন গণভোট এবং এনজিওসমূহের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে এসব কথা বলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। কর্মশালার আয়োজন করে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো।
আসন্ন গণভোটে সরকারের প্রচার কার্যক্রমের মূখ্য সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, যারা দেশ পরিচালনা করেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে নয়—বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার কারণেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হলে গণভোটে জনগণকে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে রায় দিতে হবে।
তিনি বলেন, গণভোট কী এবং কেন—এ নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। অন্যান্য সাধারণ নির্বাচনের মতোই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে এর মাধ্যমে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবে, আগামীর বাংলাদেশ কীভাবে পরিচালিত হবে।
দুটি ব্যালট পেপার পাবেন ভোটাররা।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে দুটি ব্যালট পাবেন। এর মধ্যে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যালটটি হবে সাদা রঙের, আর গণভোটের ব্যালটটি হবে রঙিন। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ পথ।
গণভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বিগত সরকারের সময়ে যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, যারা নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়ে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন—তাঁরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এই দায়িত্ব আমাদের কাঁধে দিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতিতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।
স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এনজিও ও উন্নয়নকর্মীদের অবদানের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এনজিওগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণকে গণভোট বিষয়ে সচেতন করতে এনজিওগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালায় বিশেষ আলোচকের বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐক্যমত্য) মনির হায়দার বলেন, পাকিস্তানি শাসনামলে শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অন্যথায় দেশ আবার ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মনির হায়দার আরও বলেন, জনগণ যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে, বিচার বিভাগের সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
কর্মশালায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার সুজনের পক্ষ থেকে ‘গণভোট কী ও কেন?’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাব ও গণভোট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মোঃ দাউদ মিয়া জানান, দেশে কার্যরত এনজিওগুলোর প্রত্যক্ষ উপকারভোগী প্রায় ৫০–৬০ লাখ মানুষ। তাদের পরিবার ও পরোক্ষ উপকারভোগীদের মধ্যেও গণভোট বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে এনজিওগুলো ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করবে।
কর্মশালায় দেশি-বিদেশি নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে চারশ’ এনজিওর প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
Leave a Reply