আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বিজয়ী হয়েছেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছেন ৯১ ভোট।
এই বিজয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই নির্বাচনের জন্য মাত্র তিন মাস সময় অবশিষ্ট ছিল। সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রার্থিতা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন। একই সঙ্গে তিনি বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়টি স্মরণ করেন। সে সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সীমিত সময়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এমন একটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করতে হয়েছে, যা সাধারণত কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সফল হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে গত এক বছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করে।
এই নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এছাড়াও নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনসমূহ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও বিজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত তাঁর ইন্টারঅ্যাকটিভ সংলাপ কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী ওই সংলাপে তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। এর পর থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের প্রচারণায় কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘ সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।